বয়স বাড়ার সূক্ষ্ম কিছু লক্ষণ যা আপনার জানা অত্যন্ত প্রয়োজন
বার্ধক্য মানবজীবনের এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই বয়স বাড়ার প্রক্রিয়াটি কেবল চুল পাকার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি শরীরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে শুরু হয়। তবে বাহ্যিক প্রধান পরিবর্তনের পাশাপাশি এমন কিছু সূক্ষ্ম শারীরিক পরিবর্তন ঘটে যা আমরা প্রায়শই অবহেলা করি। জেনে নিন সেই সংকেতগুলো এবং সেগুলোর স্বাস্থ্যসম্মত সমাধান।
আপনি কি কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক সমস্যা (যেমন: জয়েন্ট পেইন বা ত্বকের যত্ন) নিয়ে চিন্তিত?
এজিং সেল (Aging Cell) জার্নালে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের ডিএনএ-তে থাকা 'রেট্রোএলিমেন্ট' নামক প্রাচীন ভাইরাসের অবশিষ্টাংশ অত্যন্ত নিখুঁত 'এপিজেনেটিক ক্লক' বা জৈবিক ঘড়ি হিসেবে কাজ করে। এই জিনগত মার্কারগুলো মানবদেহে বার্ধক্যের এমন কিছু সূক্ষ্ম সংকেত সনাক্ত করতে পারে, যা প্রচলিত কালানুক্রমিক পরিমাপকগুলোতে ধরা পড়ে না।
১. অতিরিক্ত হ্যাংওভার ও অ্যালকোহল সহ্যক্ষমতা কমা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মদ বা অ্যালকোহল পরিপাক (Metabolize) করার শারীরিক ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সামান্য পানেও পরবর্তী দিনে তীব্র মাথাব্যথা ও ক্লান্তি সৃষ্টি হয়।
২. যৌন আকাঙ্ক্ষা বা লিবিডো হ্রাস পাওয়া
বয়স বৃদ্ধির সাথে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে যৌন ইচ্ছা কমতে পারে। বিশেষ করে নারীদের মেনোপজের পর এবং পুরুষদের মানসিক চাপের কারণে এই লক্ষণটি দেখা দেয়।
৩. শুষ্ক ত্বক ও নতুন স্কিন ট্যাগ
বয়সের সাথে সাথে চামড়ার আর্দ্রতা ও কোলাজেন উৎপাদন কমে যায়। ফলে বলিরেখা, ত্বকের শুষ্কতা এবং ছোট ছোট চামড়ার গুটি বা স্কিন ট্যাগ তৈরি হয়।
৪. মুখে সূক্ষ্ম রক্তনালী দৃশ্যমান হওয়া
বয়স বাড়ার সাথে সাথে ত্বকের নিচের রক্তনালীগুলো পাতলা হয়ে মুখের ত্বকের ওপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রগ দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
৫. ত্বকে খসখসে বৃদ্ধি বা সেবোরিক কেরাটোসিস
বয়স বাড়ার সাথে ত্বকে মোমের মতো বা খসখসে বাদামী আস্তরণ তৈরি হতে পারে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'সেবোরিক কেরাটোসিস' বলা হয়।
৬. শরীরের অন্যান্য অংশে চুল পাকা
কেবল মাথার চুলই নয়, বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভ্রু, দাড়ি এমনকি শরীরের অন্যান্য অংশের লোমও রূপালী বর্ণ ধারণ করতে শুরু করে।
৭. কান ও নাকে অতিরিক্ত চুল গজানো
হরমোনের পরিবর্তনের কারণে বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে কান ও নাকের ভেতরের মতো অস্বাভাবিক জায়গায় চুল তুলনামূলক ঘন হয়ে উঠতে পারে।
৮. কোমরের পরিমাপ বৃদ্ধি
একই পরিমাণ খাবার খাওয়া সত্ত্বেও বয়স বাড়লে মেটাবলিজম বা হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাওয়ার কারণে পেটে ও কোমরে চর্বি জমতে থাকে।
৯. পেশির ভর বা মাসল মাস কমে যাওয়া
বার্ধক্যে প্রাকৃতিকভাবেই মাংসপেশি সংকুচিত হতে থাকে। ফলে শরীরের সার্বিক শক্তি ও কাজ করার সক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পায়।
১০. উচ্চতা কিছুটা কমে যাওয়া
বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেৰুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং হাড়ের ঘনত্ব কমে। এর ফলে মানুষ কিছুটা খর্বাকৃতির হয়ে পড়ে।
১১. মূত্রাশয়ের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়া
মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণকারী পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় হাঁচি, কাশি বা হাসির সময় সাময়িক প্রস্রাব লিক করার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
১২. অনিয়মিত পায়খানা ও কোষ্ঠকাঠিন্য
পাকস্থলীর স্বাভাবিক সঞ্চালন ধীর হওয়া এবং প্রতিনিয়ত নানা ধরনের ওষুধ গ্রহণের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে কোষ্ঠকাঠিন্য বাড়ে।
১৩. চোখের ভ্রু পাতলা হয়ে যাওয়া
বয়সের সাথে সাথে হরমোন ক্ষরণের মাত্রা পরিবর্তনের কারণে চোখের ভ্রুর চুল ঝরে পাতলা হয়ে যেতে শুরু করে।
১৪. সাময়িক স্মৃতিভ্রষ্টতা
কথা বলতে বলতে হঠাৎ কী বলছিলেন তা ভুলে যাওয়া বা ছোটখাটো তথ্য মনে করতে অসুবিধা হওয়া বয়সের এক সাধারণ লক্ষণ।
১৫. মাড়ি সরে যাওয়া ও দাঁত মলিন হওয়া
বয়স বাড়ার সাথে সাথে দাঁতের এনামেল ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং মাড়ি দাঁতের গোড়া থেকে সংকুচিত হতে থাকে।
১৬. পায়ের আঙুল বেঁকে যাওয়া ও কড়া পড়া
দীর্ঘদিন টাইট জুতো পরার প্রভাব এবং হাড়ের পরিবর্তনের কারণে পায়ের আঙুলে কড়া (Corns) পড়ে ও আকৃতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়।
১৭. ঘাম কম হওয়া
বয়স বাড়লে শরীরের ঘামগ্রন্থিগুলো (Sweat glands) কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, ফলে গরমের দিনেও আগের মতো ঘাম হয় না।
১৮. হঠাৎ শরীরের উত্তাপ বেড়ে যাওয়া (Hot Flashes)
মেনোপজের সময় এবং পরবর্তীতে নারীদের হরমোন ওঠানামার কারণে হঠাৎ করে মুখ ও বুক তীব্র গরম হয়ে উঠতে পারে।
১৯. ঘন ঘন প্রস্রাবের ইনফেকশন (UTI)
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ার ফলে প্রস্রাব নালীতে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
২০. আঘাত বা ক্ষত সারতে দীর্ঘ সময় লাগা
রক্ত সঞ্চালনের গতি ধীর হওয়া এবং কোষ পুনর্গঠনের ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে কেটে যাওয়া বা আঘাত শুকোতে বেশি সময় লাগে।
২১. দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি হ্রাস
চোখের লেন্সের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া এবং কানের স্নায়ু দুর্বল হওয়ার কারণে দূরের বা কাছের বস্তু দেখতে ও শুনতে সমস্যা হয়।
২২. অনিদ্রা ও বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া
বয়স বাড়লে মেলোটোনিন হরমোন নিঃসরণ কমে যায়। ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না এবং গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যায়।
২৩. মানসিক প্রশান্তি ও সুখ বৃদ্ধি
একটি ইতিবাচক পরিবর্তন! গবেষণায় দেখা গেছে, বয়সের সাথে সাথে মানসিক পরিপক্কতা আসে এবং মানুষ জীবনের ছোট ছোট বিষয়ে বেশি সুখী অনুভব করে।







0 Comments