কিয়ামতের দিন আরশের ছায়া লাভকারী
সাত শ্রেণির মানুষের পরিচয়
য়ামতের দিন—যে দিনের ভয়াবহতা কল্পনারও অতীত। সেদিন কোনো মানুষ, কোনো সৃষ্টি—কারোই রেহাই নেই। প্রতিটি মাখলুককে দাঁড়াতে হবে মহান আল্লাহর ন্যায়বিচারের কাঠগড়ায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই দিনের দৃশ্য এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, যা হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়। তিনি বলেন, কিয়ামতের ময়দানে সমস্ত মানবজাতিকে একত্র করা হবে এমন এক বিশাল সমতল ভূমিতে, যা হবে লাল ও সাদা রঙের মিশ্রণে নির্মল—পরিচ্ছন্ন আটার রুটির মতো মসৃণ। সেখানে কোনো দালান, কোনো গাছ, এমনকি কোনো চিহ্নও থাকবে না—শুধু মানুষ আর মানুষ, অপেক্ষায় তাদের হিসাবের।
সেদিনের তাপমাত্রা হবে অসহনীয়। সূর্যকে মানুষের এত কাছাকাছি আনা হবে যে, তা থাকবে মাত্র এক ফরসাখ দূরে। সেই তীব্র উত্তাপে মানুষ নিজের আমল অনুযায়ী ঘামে ডুবে যাবে। কেউ থাকবে টাখনু পর্যন্ত ঘামে, কেউ হাঁটু পর্যন্ত, কেউ কোমর পর্যন্ত—আর কেউ এমন অবস্থায় পৌঁছাবে, যেখানে ঘাম মুখ ঢেকে ফেলবে। ভাবতেই শরীর শিউরে ওঠে—কী ভয়ঙ্কর হবে সেই সময়!
আর কিয়ামতের দিন যখন সূর্য অত্যন্ত কাছে থাকবে এবং আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া কোনো ছায়া থাকবে না, তখন পবিত্র হাদীস অনুযায়ী [বুখারী ও মুসলিম] সাত শ্রেণীর মানুষ বিশেষ নিরাপত্তা ও ছায়া পাবেন:
কিয়ামত—আরবি শব্দ, যার অর্থ দাঁড়িয়ে থাকা। এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই মহা দিনের দৃশ্যপট: বিচার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এক অনন্ত প্রতীক্ষায়। সেদিন সূর্য নেমে আসবে মাথার একেবারে উপর, তাপ ও ভয়ের তীব্রতায় পৃথিবী হবে অসহনীয়। হাশরের বিশাল প্রান্তরে কোথাও কোনো আশ্রয়, কোনো ছায়া থাকবে না—শুধু আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যতীত। সেই দুর্বিষহ মুহূর্তে একমাত্র নেককার, সত্যিকার ইমানদাররাই পাবেন সেই সুশীতল ছায়ার পরম প্রশান্তি।
এই সাত শ্রেণির মানুষ কারা? কী তাদের সেই আমল, যা তাদের এনে দেবে এই মহা সম্মান?
চলুন, পরবর্তী অংশে আমরা জানি—সেই সৌভাগ্যবান সাত শ্রেণির মানুষের পরিচয়, যারা কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেয়ে আশ্রয় পাবে আল্লাহর আরশের ছায়াতলে।
রাসূল ﷺ বলেন— “কিয়ামতের দিন সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে, যেদিন অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।” সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম.
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক, ২. আল্লাহর ইবাদতে বেড়ে ওঠা যুবক, ৩. মসজিদে মন পড়ে থাকা ব্যক্তি, ৪. আল্লাহর জন্য ভালোবাসা স্থাপনকারী দু’জন ব্যক্তি, ৫. নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু বিসর্জনকারী, ৬. পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা ব্যক্তি, এবং ৭. গোপনে দানকারী ।
আলোচ্য হাদিসে কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ সময়ে যখন মানুষ দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করবে একটু ছায়ার সন্ধানে — তখন উপরোক্ত বিশেষণে বিশেষিত ব্যক্তিবর্গ আল্লাহতায়ালার বিশেষ কৃপা লাভ করবেন এবং তাঁর ছায়াতলে আশ্রয় পাবেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে এখানে আরশের ছায়াকে বুঝানো হয়েছে, যা অন্য সূত্রে বর্ণিত হাদিস দ্বারা সমর্থিত।
সাত ব্যক্তির বিস্তারিত বর্ণনা
ন্যায়পরায়ণ শাসক
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.)-এর মতে এখানে শাসক দ্বারা কোনো দেশ বা এলাকার নির্বাহী প্রধানকে বুঝানো হয়েছে। তবে মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত যে সব লোক ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে তাদের ক্ষেত্রেও উক্ত বিধান প্রযোজ্য হবে। ন্যায়পরায়ণতা বলতে প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার বিধান অনুসরণ করাকে বুঝানো হয়েছে।
"আর যখন তোমরা মানুষের মাঝে বিচার করবে ন্যায়পরায়ণতার সাথে করবে।" — সূরা আন নিসা : ৫৮
ইবাদতে বেড়ে ওঠা যুবক
যে যুবক আল্লাহতায়ালার ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে। এখানে যুবককে বিশেষিত করা হয়েছে এ কারণে যে, যৌবনকালে মানুষ প্রবৃত্তি দ্বারা বেশি তাড়িত হয়ে থাকে। তাই প্রবৃত্তিকে দমন করে আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দিয়ে যে যুবক আল্লাহর ইবাদতে আত্মনিয়োগ করে তার জন্য এই মহা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
মসজিদ-সংলগ্ন হৃদয়ের মানুষ
যে ব্যক্তির অন্তর মসজিদের সাথে ঝুলন্ত থাকে। অর্থাৎ মসজিদের বাইরে অবস্থান করলেও মসজিদের সাথে মন লেগে থাকে এবং অপেক্ষায় থাকে আবার কখন মসজিদে প্রবেশ করবে। কেউ কেউ এর দ্বারা নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায়ের গুরুত্বের কথা বলেছেন।
আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসাকারী দুই ব্যক্তি
এমন দুই ব্যক্তি যারা একে অন্যকে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায় ভালোবাসে। এই ভালোবাসা বাহ্যিকভাবে হলে হবে না, বরং তা প্রকৃতপক্ষেই ভালোবাসা হতে হবে। দু'জনে একত্রে থাকুক বা আলাদা থাকুক — এই ভালোবাসায় কোনো ঘাটতি হবে না। মুতার যুদ্ধের সেই তিন বীর যোদ্ধার কাহিনী এর উজ্জ্বল নজির। এই ভালোবাসায় দুনিয়াবি কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না।
নির্জনে অশ্রুসিক্ত নেত্রে আল্লাহর স্মরণকারী
যে ব্যক্তি লৌকিকতা পরিহার করে নির্জনে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ করে — সেটা মুখে হোক বা অন্তরে হোক। সেই স্মরণে সাথে সাথে তার দু'নয়ন অশ্রুসিক্ত হয়, সে থাকে সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত। সকল মানুষ যখন নিদ্রায় মগ্ন, তখন নির্জনে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকা জান্নাত লাভের অন্যতম পাথেয়।
আল্লাহর ভয়ে প্রলোভন প্রত্যাখ্যানকারী
এমন ব্যক্তি যাকে কোনো সুন্দরী, বংশীয় ও প্রভাবশালী নারী ব্যভিচারের দিকে আহবান করে — তখন সে বলে "আমি আল্লাহকে ভয় করি।" আল্লাহর নবী হজরত ইউসুফ (আ.) মিসরের সম্রাট পত্নী জোলায়খার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে জেলখানাকে উত্তম বাসস্থান হিসেবে গ্রহণ করেছেন — যা পবিত্র কোরআনের সূরা ইউসুফে বর্ণনা করা হয়েছে।
গোপনে দানকারী
এমন ব্যক্তি যিনি তার দানকে এমনভাবে গোপন রাখেন যেন ডান হাত কী দান করল বাম হাত জানতে পারল না। আল্লামা নববী (রহ.) বলেছেন, ফরজ দান গোপনে করার চাইতে প্রকাশ্যে করাই উত্তম। ইবনে মালেক বলেন, এই গোপনীয়তা নফল দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, কারণ জাকাত প্রকাশ্যে দেওয়া উত্তম।
গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ টীকা
উপরোক্ত হাদিসে কিয়ামত দিবসে আরশের নিচে ছায়া প্রাপ্য যে সাত শ্রেণির লোকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতেই সীমাবদ্ধ নয়। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) গবেষণা করে আরো অনেক বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেয়েছেন এবং এ বিষয়ে তিনি স্বতন্ত্র গ্রন্থও রচনা করেছেন। এতে বুঝা গেল যে, উপরোক্ত হাদিসের সাত সংখ্যাটি মুখ্য নয়।
হাদিসের আলোকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সকল পর্যায়ে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা করা। অন্যায়, অনাচার, অত্যাচার থেকে বেঁচে থাকা — কারণ পরকালে এ জন্য কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।
ইবাদত জীবনের সকল স্তরে গুরুত্বপূর্ণ হলেও যৌবনকালের ইবাদতের মর্যাদা বেশি। তাই যৌবনকালে কষ্ট হলেও ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা।
মুমিনের অন্তর সর্বদা মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে এবং মসজিদই হবে তার আত্মার ঠিকানা। এর ফলে মসজিদভিত্তিক সুষম সমাজ গড়ে উঠবে।
মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, হাদিয়া, সহযোগিতা সকল কাজ হবে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। এ সব বৈশিষ্ট্য ঈমানের পূর্ণতার লক্ষণ।
আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভের জন্য নির্জনতা সর্বোত্তম কৌশল এবং মুমিনের চোখের পানি আল্লাহতায়ালার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ও প্রিয়।
প্রতিকূল পরিবেশে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজের সম্ভ্রম বজায় রাখা ইবাদত বিশেষ।
নফল দান-খয়রাত করার সময় সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা ও আত্মপ্রচার থেকে নিজেকে দূরে রাখা মুমিন চরিত্রের ভূষণ।









0 Comments