ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজীর বদলে যাওয়া জীবনের ঈর্ষণীয় উপাখ্যান
প্রকাশিত: ১০ মে, ১৯৮৬ (পুনর্মূল্যায়ন ২০২৪) | সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, সাপ্তাহিক শাহীন
অজ্ঞানতার দুনিয়ায় আমি ‘ভগবান’ হিসেবে পূজিত ছিলাম, আলোকিত বিশ্বে আমি নিজকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি।
— ডঃ স্বরূপজী (Dr. Swaroop ji)
হেদায়েতের আলো আভায় উদ্ভাসিত রঙিন জীবন — পৃথিবীতে এ মহাসৌভাগ্য যারা লাভ করেছেন, তাদের অন্যতম একজন হলেন ভারতের ৭০ কোটি হিন্দুর সাক্ষাৎ ভগবান ড. শিবশক্তি স্বরুপজি (Dr. Shiv Shakti Swaroop ji)। হিদায়াতের নূরে উদ্ভাসিত আলোকিত হয়ে পৃথিবীর সেরা আলোকিত মানুষে পরিণত হয়েছিলেন ড. শিবশক্তি। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় সারা বিশ্ব বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সারা দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য সকল মিডিয়া তা গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছিল। তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনী সত্যান্বেষী ও সত্যপ্রিয় যে কোনো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার আকর হয়ে থাকবে।
জন্ম ও পরিচয়
ডঃ সাহেব ভারতের বৃন্দাবনে জন্মগ্রহণ করেছেন। আর এ বৃন্দাবনেই হিন্দুদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম। হিন্দুসমাজ এ বৃন্দাবনকে তাদের পবিত্র তীর্থভূমি হিসেবে বিবেচনা করে। রাধা কৃষ্ণের লীলাভূমি নামেও এটি সারা পৃথিবীতে পরিচিত। ভারতের হিন্দুসমাজ মনে করতেন, রাধা কৃষ্ণের এ লীলাভূমি বৃন্দাবনেই আরেক ভগবান জন্মগ্রহণ করে ‘শিবশক্তি’ নামধারণ করেছেন।
ডঃ শিবশক্তি উত্তর ভারতের মথুরা জেলার বৃন্দাবনে ১৯৩৬ সালে এক ঐতিহ্যবাহী মোহন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তারা বংশানুক্রমেই সর্বস্বামী বা মোহন্ত। তার পিতার নাম প্রিতমদাস উদাসেন এবং মায়ের নাম ভানুমতি কর। তাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সন্তান হলেন শিবশক্তি।
বারটি ভাষায় পন্ডিত
পৃথিবীর বারটি ভাষায় তিনি পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। যার মধ্যে অন্যতম হলো ইংরেজি, সংস্কৃত, গ্রিক, উর্দু, পালি, মারাঠি, গোরমুখি, গুজরাটি, আরবী প্রভৃতি ভাষা। এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অরিয়ান্টালিজম এ মাস্টার্স, গুরুকুল কাংড়ি থেকে ‘আচারিয়া’, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বিশ্বের দশটি প্রধান ধর্মের উপর ডক্টরেট অব ডিভাইনিটি এবং অরিয়ান্টালিজম এ পিএইচডি অর্জন করেন।
জোর করে কারো মন জয় করা যায় না। ইসলাম প্রচারকদের চরিত্র মাধুর্য আর মানবতায় মুগ্ধ হয়েই হিন্দু সমাজে অত্যাচারিত হিন্দুরা ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিল। নিম্নবর্ণ নয়, উচ্চ বর্ণের অনেক হিন্দুই ইসলামের সুমহান আদর্শে উজ্জিবিত হয়ে তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, যার সর্বশেষ উদাহরণ ভারতের প্রায় ১০০ কোটি হিন্দুর ভগবান ড. শিবশক্তি স্বরুপজি। তিনি পৃথিবীর ১২টি ভাষাতে দক্ষ ছিলেন। যিনি ভারতের মথুরা জেলার বৃন্দাবনে ১৯৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
হিন্দু গবেষকদের মতে, এ বৃন্দাবনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাই বৃন্দাবন ছিল তাদের তীর্থভূমি। ভারতের হিন্দু সমাজের মতে, রাধাকৃষ্ণের লীলাভূমিতেই আরেক ভগবান জন্মগ্রহণ করে শিবশক্তি নাম ধারণ করেছেন। অথচ, সেই তিনিই ১৯৮৬ সালে ইসলামে দীক্ষিত হন। ইসলাম গ্রহণের পরে তিনি ড. ইসলামুল হক নামে বিশ্বময় পরিচিতি পান।
শিক্ষা জীবন এবং উচ্চ শিক্ষা
ড. শিবশক্তি সুরুপজী" পিতার আশ্রমেই শিবশক্তি প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অরিয়ান্টালিজম এ মাস্টার্স করেন। গুরু কুল কাংড়ি থেকে ‘আচারিয়া’ পদবি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বিশ্বের দশটি প্রধান ধর্মের উপর ডক্টরেট অব ডিভাইটিটি এবং অরিয়ান্টালিজম এ আরেকটি ‘পি এইচ ডি লাভ করেন। অর্থাৎ
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে বিশ্বের দশটি ধর্মের উপর ডক্টরেট অব ডিভাইসি এবং অরিয়ান্টালিজম এ অারেকটি পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেন
তিনি বারোটির অধিক ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। ইংরেজী, সাংস্কৃতি, অারবী, গ্রীক, উর্দু, গুজরাটি, পালি ইত্যাদি ভাষায় ছিলো তার বিশাল পান্ডিত্য।
মানসিক উপলব্ধি:
নিজের এই পরিবর্তন সম্পর্কে ড. শিবশক্তি সুরুপজী" নিজে বলেছেন, "অজ্ঞানতার দুনিয়ায় আমি 'ভগবান' হিসেবে পূজিত ছিলাম, আলোকিত বিশ্বে আমি নিজকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি" তাঁর এই রূপান্তরকে অনেকেই এক ঐশ্বরিক হিদায়াত বা দিকনির্দেশনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন
সত্যের সন্ধান:
সব ঐশ্বর্য ও সম্মান থাকা সত্ত্বেও, তিনি জীবনের পরম সত্য ও স্রষ্টার সঠিক পরিচয় জানার তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন। পবিত্র কুরআন ও ইসলামের ইতিহাস নিয়ে গভীর অধ্যয়নের পর তিনি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।
“ভারত সরকার আমার নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। আমি যদি বায়তুল মোকাররমের পাশে ফুটপাতে মুসল্লীদের জুতা পালিশ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়, তবুও সত্য ধর্ম ইসলাম থেকে এক চুল সরবো না।”
— ড. শিবশক্তি স্বরূপজী (ইসলামুল হক), বাংলাদেশ সফরে।
আরও পড়ুন :
সাক্ষাৎকার: অমূল্য আলাপন
✅ ডঃ স্বরূপজী ইসলামে মুক্তির স্বাদ পেলেন গত ১০ই মে (১৯৮৬) ভারতের সাম্প্রতিক কালের এক মহাত্মা ধর্মগুরু যিনি সেদিন পর্যন্ত সেদেশের সর্বত্র ‘ভগবান’ নামে পরিচিত ও পূজিত ছিলেন সেই ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন নিজ স্ত্রী ও কন্যাসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার নতুন নাম রাখা হয় ইসলামুল হক, পত্নীর নাম খাদিজা হক আর কন্যার নাম রাখা হয় আয়েশা হক। গুজরাটের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘শাহীন’ এর তরফ হতে ডঃ ইসলামুল হকের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় । "৮৭ সালের ১ মার্চ সাপ্তাহিক ‘শাহীন’-এ প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকার পরবর্তীতে বাংলায় অনূদিত হয়ে দৈনিক ইত্তেফাক-এ মুদ্রিত হয়। আমরা দৈনিক ইত্তেফাকের সেই সাক্ষাৎকারটি এখানে হুবহু উপস্থাপন করছি।"
আমি কতক্ষণ ধরে এ স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা আমার মনে নেই। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম রাত তিনটা বাজে। একই রাতে, একই সময়ে আমার স্ত্রীও এ ধরনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। … আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের প্রথম শতাব্দীর মুসলমান বলে ভাবতে লাগলাম। আমি বিধিসম্মতভাবে মুসলমান হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম, এখানে সেখানে ঘুরি, আর মুসলমানদের সাথে সম্পর্ক বাড়াই। চুপিসারে নামায পড়ি। এবাদত বন্দেগী করি। পরিশেষে ভাগ্যক্রমে আলেমদের শহর ভূপাল পৌঁছই। ১৯৮৬-এর ১০ই মে, রমজান মাসের চাঁদ দেখার সাথে সাথে আমি আমার স্ত্রী আর আমার যুবতী কন্যা প্রকাশ্যভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি। আলহামদুলিল্লাহ
আমার জন্ম ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী। জন্মস্থান মথুরা, বৃন্দাবন। আমি প্রায় ১২টি ভাষা জানি, এর মধ্যে ইংরেজী, সংস্কৃত, গ্রীক, হিন্দি, পালি, গোরমুখী, মারাঠী, গুজরাতি, উর্দু ও আরবী আমার ভাল লাগে। … আগেই বলেছি, আমি দুনিয়ার দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর তুলনামূলক পড়াশুনা ও গবেষণা করেছি। সে জন্য সত্য স্বীকারে আমার কোন সংকোচ ছিল না। আমার সমকালীনদের মধ্যে হিন্দু জগতের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব ও পন্ডিত রয়েছেন। যেমন জগৎগুরু শংকরাচার্য, রামগোপাল শারওয়ালে, পুরীর শংকরাচার্য, মহামন্ডেলশ্বর স্বামী অখন্ডানন্দজী, গুরু গোলওয়ালকার বাবা সাহেব দেশমুখ, বালঠাকুরে, অটলবিহারী বাজপায়ী, নানা সাহেব, দেশমুখ, বিনোবা ভাবে এবং অন্যান্য।
একবার তিনি তার “পরমধাম” আশ্রমে আমাকে বক্তৃতাদানের বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে দাদা ধর্মাধীকারী আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসেনঃ “আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম সম্বন্ধে পড়াশুনা করেছেন, মানুষের জন্য কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়? আমি জবাবে বলেছিলাম,‘ইসলাম’ আমার জওয়াবে দাদা খুশী হন নাই। তিনি বলেন, উঠেন, “ইসলাম নানা বাধা-বন্ধন আরোপ করে।” আমি জবাব দিলাম, “যে বন্ধন বাঁধে, সেই বন্ধনই মুক্তি দিতে পারে। আর যে প্রথম থেকে স্বাধীন, তার সারা জীবনের জন্য বন্ধন সৃষ্টি প্রবণতা থেকে যাবে। এ ধরনীতে মানুষকে এক সাথে বেঁধে রাখার জন্য বন্ধনকারী ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে, যা তাদের পৃথিবীতে ভাল করে বেঁধে রাখবে এবং পরলোকে মুক্ত করে দেবে। আর এ রকম ধর্ম আমার মতে একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। ইসলাম ছাড়া এরকম ধর্ম আমি আর দেখি না।”
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
সূত্র: গুজরাটের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘শাহীন’ (১ মার্চ ১৯৮৭) ও দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সাক্ষাৎকার। ডঃ ইসলামুল হকের আত্মত্যাগ ও সত্যের পথে পাড়ি দেওয়া আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী এবং ইসলাম সম্পর্কে সাধারণ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলো এখানে তুলে ধরা হলো।









0 Comments