সন্তান গড়ার কৌশল: ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে শিশুকে রক্ষার ৬টি কার্যকর উপায়
একটা সময় ছিল যখন শিশু-কিশোররা মাটি বা অন্য কোনো আঠালো কিছু মাধ্যম ব্যবহার করে নানা ধরনের খেলনা বা পুতুল ইত্যাদি বানিয়ে তাদের সৃষ্টিশীল দক্ষতা বৃদ্ধির চর্চা করত। এখন এর জায়গা করে নিয়েছে নানা ধরনের মোবাইল বা ট্যাবলেট-এর মাধ্যমে দৃশ্যমান নানা ধরনের কম্পিউটার গেম ।
স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং কম্পিউটার গেমস থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার বর্তমান যুগে এটি প্রায় অসম্ভব। বিশেষত গত কয়েক বছরে, কম্পিউটার গেমের গ্রাহকরা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিনোদন হিসাবে, এই গেমগুলি সর্বাধিক দর্শক-বিনোদন নিয়েছে। ফলস্বরূপ, রেসিং ক্রীড়া এবং শরীরের অনুশীলনগুলি বর্তমান যুগের শিশু এবং কিশোর -কিশোরীদের গুরুত্ব হারিয়েছে।
টেলিভিশন, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ছাড়া আজকের শিশুদের অবসর কাটে না। কিন্তু ভিডিও গেমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সন্তানের শরীর, মন ও নৈতিকতা—তিনটিকেই ঝুঁকিতে ফেলে। এই লেখায় সন্তান গড়ার কৌশল হিসেবে ৬টি ব্যবহারিক ধাপ জানানো হয়েছে।
সন্তান গড়ার কৌশল: খেলাধুলার জগতে কী পরিবর্তন এসেছে?
একসময় শিশু-কিশোররা মাটি দিয়ে খেলনা বানিয়ে বা মাঠে দৌড়ঝাঁপ করে সৃজনশীলতা ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়াত। এখন সেই জায়গা নিয়েছে মোবাইল ও ট্যাবলেটের গেম। অভিভাবকরাও অনেক সময় বাধ্য হয়ে স্মার্টফোন কিনে দিচ্ছেন। গত চার দশকেরও কম সময়ে ভিডিও গেম বিশ্বের বড় একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
রেসিং, দৌড় ও শরীরচর্চার জায়গা এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দখল করেছে স্ক্রিন-নির্ভর বিনোদন।
শিশুরা গেমের প্রতি কেন আকৃষ্ট হয়?
গেমে নিজের পছন্দমতো নিয়ম বেছে নেওয়া যায়, কাল্পনিক নায়ক হওয়া যায় এবং দক্ষতার জন্য পয়েন্ট পাওয়া যায়। এই তাৎক্ষণিক পুরস্কারই শিশুদের বারবার ফিরিয়ে আনে।
ভিডিও গেমের ক্ষতি: শিশুর শরীর, মন ও নৈতিকতায় প্রভাব
অতিরিক্ত গেম আসক্তির প্রধান ঝুঁকি
- দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে চোখ, মস্তিষ্ক ও শরীরের ক্ষতি; স্থূলতার ঝুঁকি
- সহিংসতা স্বাভাবিক মনে হওয়া এবং আচরণে হিংস্রতা
- একাকীত্ব, আত্মকেন্দ্রিকতা ও সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি
- কিছু গেমে উগ্র মতবাদ বা ঘৃণা ছড়ানোর ঝুঁকি
- বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ কমে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া
যেসব গেমে বেশি সংঘর্ষ করলে বেশি পয়েন্ট মেলে, সেখানে শিশুরা ধীরে ধীরে ভাবতে শেখে যে সহিংসতাই সমস্যার সমাধান। এছাড়া বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় এই আসক্তি আরও বেড়েছে, তাই নজরদারি এখন বেশি জরুরি।
ইতিবাচক দিকও আছে: সঠিকভাবে বেছে নিলে গেম গণিত, সাধারণ জ্ঞান ও চিত্রাঙ্কন শেখাতে সাহায্য করে। তাই লক্ষ্য গেম নিষিদ্ধ করা নয়, বরং ভারসাম্য আনা।
আদর্শ সন্তান গড়ার ৬টি ধাপ
সন্তানের খেলার সঙ্গী হোন
সন্তান যে খেলাতেই মগ্ন থাকুক, অল্প সময়ের জন্য হলেও আপনি পাশে বসুন। গেমে কী ঘটছে, কেন ঘটছে—তা নিজে দেখলে বুঝতে পারবেন সেটি আপনার সন্তানের জন্য উপযুক্ত কি না।
করণীয়: দিনে অন্তত ১৫ মিনিট সন্তানের পছন্দের খেলায় অংশ নিন।
গেমের ভালো-মন্দ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন
গেমের দোষত্রুটি ধমক দিয়ে নয়, আলোচনার মাধ্যমে তুলে ধরুন। প্রশ্ন করুন: "এই গেমে যা হচ্ছে, বাস্তবে হলে কেমন হতো?" এতে শিশু নিজেই ভালো-মন্দ বিচার করতে শেখে।
করণীয়: সহিংস দৃশ্যের পর শান্তভাবে মতামত জিজ্ঞেস করুন।
স্ক্রিন টাইমের সুস্পষ্ট সীমা ঠিক করুন
প্রয়োজনে গেম খেলার সময় ও ধরন নিয়ন্ত্রণ করা অভিভাবকের দায়িত্ব। সময়সীমা আগে থেকে সন্তানের সঙ্গে ঠিক করলে সে নিয়ম মানতে বেশি রাজি হয়। বয়স-উপযোগী গেম বেছে দিন এবং ডিভাইসে প্যারেন্টাল কন্ট্রোল চালু রাখুন।
করণীয়: পড়ার সময়, খাবারের সময় ও রাতে ডিভাইস বন্ধ রাখার নিয়ম করুন।
শারীরিক ও দলগত খেলায় উৎসাহ দিন
অতীতের খেলায় শরীরচর্চা ও বন্ধুত্ব দুটোই হতো। আজ শিশুরা একা খেলে, ফলে হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে। মাঠের খেলা, সাঁতার বা পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দিন।
করণীয়: প্রতিদিন অন্তত ৩০–৬০ মিনিট বাইরের খেলা নিশ্চিত করুন।
সৃজনশীল ও শেখার কাজে আগ্রহ তৈরি করুন
মাটির খেলনা বানানো, ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া বা বিজ্ঞানের ছোট পরীক্ষা শিশুর সৃজনশীলতা বাড়ায়। গেমকে শেখার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে গণিত বা সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক গেম বেছে নিন।
করণীয়: সপ্তাহে একদিন পরিবারসহ হাতের কাজ বা আঁকার সময় রাখুন।
পারিবারিক বন্ধন ও নৈতিক শিক্ষা মজবুত করুন
প্রযুক্তি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ায়। একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা ও ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শেখানোর নিয়মিত সময় রাখুন। মনে রাখবেন, সন্তান আপনার কথার চেয়ে আচরণ বেশি অনুকরণ করে।
করণীয়: রাতের খাবারের সময় সবাই ফোন দূরে রাখুন।
সন্তান গড়ার কৌশল নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
ভিডিও গেম কি শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ খারাপ?
না। সীমিত সময়ে ও বয়স-উপযোগী গেম শেখা ও বিনোদনে সাহায্য করতে পারে। সমস্যা হয় অতিরিক্ত আসক্তি ও সহিংস কনটেন্টে।
শিশুর গেম আসক্তি বুঝব কীভাবে?
গেম বন্ধ করতে বললে রেগে যাওয়া, পড়াশোনা ও খেলাধুলায় অনীহা, বন্ধুদের থেকে দূরে থাকা এবং ঘুমের সমস্যা আসক্তির লক্ষণ হতে পারে।
ভিডিও গেমে কি উগ্র মতবাদ ছড়ানো হয়?
কিছু গেমে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত ঘৃণামূলক বার্তা থাকতে পারে। তাই সন্তান কোন গেম খেলছে তা জানা এবং রেটিং যাচাই করা জরুরি।
কত বছর বয়স থেকে সন্তান গড়ার কাজ শুরু করা উচিত?
শৈশব থেকেই। ছোটবেলায় পরিবার থেকে পাওয়া অভ্যাস ও মূল্যবোধ সারা জীবন প্রভাব ফেলে।
করোনার সময় গেমের আসক্তি কেন বেড়েছিল?
স্কুল সরাসরি বন্ধ থাকায় শিশুরা বেশি সময় ঘরে স্ক্রিনের সামনে কাটিয়েছে, ফলে অভিভাবকদের নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।






0 Comments