কেন টিকটক ও রিলস কনটেন্টকে বলা হচ্ছে ‘লো-কোয়ালিটি ডিজিটাল ডায়েট’
অবিরাম রিলস ও টিকটক স্ক্রলিংয়ে দুর্বল হচ্ছে মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তি
অবিরাম রিলস আর টিকটকের স্ক্রলিং হয়তো নিছক বিনোদন মনে হয়, কিন্তু এর প্রভাব নীরবে আঘাত করছে মস্তিষ্কের গভীরে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের দ্রুতগতির ভিডিওতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় আমাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে, আর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এই ধরনের কনটেন্ট মস্তিষ্ককে তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় আটকে রাখে, ফলে ধীর চিন্তা, বিশ্লেষণ এবং গভীর মনোযোগের মতো জটিল মানসিক প্রক্রিয়াগুলো ক্রমেই ঝাপসা হয়ে যায়। ফলাফল হিসেবে আমরা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছি, ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছি এবং নিজের অজান্তেই এক ধরনের মানসিক ক্লান্তির ফাঁদে আটকে পড়ছি—যার নাম আজ ‘ব্রেন রট’।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে আমাদের হাতের মুঠোয় বিনোদনের অভাব নেই। কিন্তু এই বিনোদনই কি আমাদের অজান্তে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে? সাম্প্রতিক American Psychological Association (APA) এর একটি গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত শর্ট-ফর্ম ভিডিও (SFV) স্ক্রলিং আমাদের মস্তিষ্কে 'ব্রেন রট' বা নিউরোকগনিটিভ ক্ষয় তৈরি করছে।
‘ব্রেন রট’ (Brain Rot) কী এবং কেন এটি উদ্বেগের কারণ?
২০২৩ সালে অক্সফোর্ড ডিকশনারির ‘Word of the Year’ হওয়া এই শব্দটি এখন আর কেবল মিম নয়। এটি মূলত নিম্নমানের ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট মানসিক স্থবিরতা এবং মনোযোগের ঘাটতিকে নির্দেশ করে। যখন আমরা টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো দ্রুতগতির ভিডিও দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক উচ্চমাত্রার ডোপামিন নিঃসরণ করে, যা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
APA প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম
“Feeds, Feelings, and Focus: A Systematic Review and Meta-Analysis Examining the Cognitive and Mental Health Correlates of Short-Form Video Use”।
এই গবেষণায় TikTok, Instagram Reels এবং YouTube Shorts-এর মতো অ্যালগরিদম-নির্ভর শর্ট-ফর্ম ভিডিও (SFV) প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সরাসরি ‘ব্রেন রট’ বা নিউরোকগনিটিভ ক্ষয়ের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে।
এপিএ (APA) গবেষণার মূল ফলাফল
APA প্রকাশিত “Feeds, Feelings, and Focus” শীর্ষক মেটা-অ্যানালাইসিসে গবেষকরা ৭১টি আলাদা স্টাডির তথ্য বিশ্লেষণ করেন, যেখানে মোট অংশগ্রহণকারী ছিলেন ৯৮,২৯৯ জন। ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক—যত বেশি কেউ শর্ট-ফর্ম ভিডিও দেখেন, ততই তার মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা (inhibitory control) কমে যায়। গবেষণার প্রধান ফলাফলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | প্রভাব/ফলাফল |
|---|---|
| মনোযোগ (Attention Span) | তীব্রভাবে হ্রাস পায় |
| আবেগ নিয়ন্ত্রণ (Self-Control) | দুর্বল হয়ে পড়ে |
| গড় স্ক্রলিং সময় | তরুণদের ক্ষেত্রে দৈনিক ৬.৫ ঘণ্টা |
| মানসিক প্রভাব | উদ্বেগ, একাকিত্ব ও বডি ইমেজ সমস্যা |
ব্রেনের রিওয়ার্ড সিস্টেম ও মানসিক স্বাস্থ্য
এই অভ্যাস মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে অতিরিক্তভাবে সক্রিয় করে, যা আরও বেশি স্ক্রল করার প্রবণতা তৈরি করে। এর ফলাফল হিসেবে দেখা দিতে পারে—
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি
আত্মসম্মান ও বডি ইমেজ সমস্যায় ভোগা
ঘুমের সমস্যা
বাড়তি উদ্বেগ ও একাকিত্ব
অর্থাৎ, শুধু মনোযোগ কমে যাওয়া নয়—মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব গভীর।
কেন এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, শর্ট-ফর্ম ভিডিও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
তারা লিখেছেন,
“এই গবেষণা ভবিষ্যতে কগনিটিভ ও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো কম আলোচিত বিষয় নিয়ে গবেষণার ভিত্তি তৈরি করবে এবং মানুষকে আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারে সহায়তা করবে।”
কিভাবে আমাদের রিওয়ার্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা মস্তিষ্কের Reward System-কে অতিরিক্ত উদ্দীপিত করে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা ‘ডোপামিন লুপ’-এ আটকা পড়ে যান। ফলাফলস্বরূপ, সাধারণ পড়াশোনা, কোনো সমস্যা সমাধান বা বই পড়ার মতো ধীরগতির কাজে মস্তিষ্ক আর আনন্দ খুঁজে পায় না। এটি দীর্ঘমেয়াদে আত্মসম্মান হানি এবং ঘুমের সমস্যার মতো শারীরিক ও মানসিক জটিলতা তৈরি করে।
ডিজিটাল ব্রেন রট থেকে মুক্তির উপায়
মস্তিষ্ককে পুনরায় সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে গবেষকরা কিছু ভারসাম্যপূর্ণ অভ্যাসের পরামর্শ দিয়েছেন:
- ডিজিটাল ডিটক্স: দিনে অন্তত ১-২ ঘণ্টা স্মার্টফোন থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।
- বই পড়ার অভ্যাস: অন্তত ১৫-২০ মিনিট গভীর মনোযোগ দিয়ে বই পড়ুন।
- অফলাইন শখ: বাগান করা, ছবি আঁকা বা খেলাধুলার মতো সৃজনশীল কাজে সময় দিন।
- টাইমার ব্যবহার: সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপগুলোতে ব্যবহারের সময়সীমা বা ডেইলি লিমিট সেট করে দিন।
আপনার মস্তিষ্ক আপনার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আজই স্ক্রলিং কমিয়ে ভাবতে শিখুন।
কম স্ক্রল করুন, বেশি ভাবুন—আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে ধন্যবাদ দেবে।






0 Comments